অর্থবছরের প্রথম দুই মাস

দেশে আসা বিদেশী ঋণের ৮৯ শতাংশই ব্যয় হয়েছে দায় পরিশোধে

রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের গতি বাড়তে থাকায় বিদেশী ঋণ পরিশোধে সংকটে পড়তে হচ্ছে না সরকারকে। তবে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম দুই মাসে বিদেশী ঋণে যা এসেছে, তার ৮৯ শতাংশই ব্যয় হয়ে গেছে আগের ঋণ ও সুদ পরিশোধে।

রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের গতি বাড়তে থাকায় বিদেশী ঋণ পরিশোধে সংকটে পড়তে হচ্ছে না সরকারকে। তবে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম দুই মাসে বিদেশী ঋণে যা এসেছে, তার ৮৯ শতাংশই ব্যয় হয়ে গেছে আগের ঋণ ও সুদ পরিশোধে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, জুলাই-আগস্ট দুই মাসে বিদেশী ঋণ এসেছে ৭৫ কোটি ডলার। একই সময়ে ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার বিদেশী ঋণ শোধ করতে হয়েছে। সে হিসাবে সরকারের ঋণের তহবিলে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কেবল ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

ইআরডি বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নেয়া আগের বিদেশী ঋণ পরিশোধ হয়েছে ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের একই সময়ে ৫৮ কোটি ৯২ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের হার বেড়েছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। এ সময়ে পরিশোধকৃত বিদেশী ঋণের ৪৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার ছিল মূল ঋণ। বাকি ১৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলার ঋণের সুদ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে।

বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৫ সাল থেকে দেশের ওপর ঋণের আসল পরিশোধের চাপ শুরু হয়ে গেছে। এর আগে শুধু সুদ দেয়া হতো, কিন্তু এখন মূল ঋণও শোধ করতে হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক বছর এটি ধারাবাহিকভাবে বাড়বে।’

ঋণ করে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে উল্লেখ করে ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘বিদেশী ঋণ দিয়ে ঋণ পরিশোধের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেটি থেকে বের হতে বহু সময় লাগবে। কারণ এ ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকবে।’ উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কথায় কথায় ঋণ নেয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইআরডির প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে রাশিয়া। এ দেশটির কাছ থেকে দুই মাসে এসেছে ৩১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। রাশিয়া থেকে অর্থছাড়ের কারণ হলো পাবনার রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এ প্রকল্পের প্রায় পুরোটাই রাশিয়ার ঋণে তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ প্রকল্প থেকে। দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটির কাছ থেকে দুই মাসে অর্থছাড় হয়েছে ২৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির কাছ থেকে ছাড় হয়েছে ৯ কোটি ৯১ লাখ ডলার।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলে গত দেড় দশকে বিদেশী উৎস থেকেও অস্বাভাবিক হারে ঋণ নিয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের জুন শেষে বিদেশী উৎস থেকে নেয়া সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে বিদেশী এ ঋণ ৬৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে ঠেকে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর বিদেশী ঋণের প্রবাহে কিছুটা ভাটা পড়ে। ২০২৫ সালের জুনে এসে সরকারের বিদেশী ঋণের স্থিতি ৮০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। স্থিতি বাড়ার পাশাপাশি বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল, সেটি গত অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

সরকারের পাশাপাশি গত দেড় দশকে দেশের বেসরকারি খাতও বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নিয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ১৯ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে এ মুহূর্তে ১১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিদেশী ঋণ রয়েছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ধরলে বিদেশী এ ঋণের স্থিতি ১৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

অর্থনৈতিক নানা সংকট, অর্থ পাচার ও সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাবে ২০২০ সাল-পরবর্তী সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি নাজুক হতে শুরু করে। ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে এসে শুরু হয় তীব্র ডলার সংকট। এ সংকট এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার ৪০ শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন ঘটে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হয় আওয়ামী লীগ সরকার। নানা কঠোর শর্ত মেনেও সংস্থাটির সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ ঋণ কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি বা ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।

এদিকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ কতটা বৈদেশিক ঋণ নিতে পারবে তার ওপর একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে আইএমএফ। চলতি বছরের জুনে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি পর্যালোচনার সময় সংস্থাটি এ নতুন শর্ত যোগ করে। শর্ত অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে পারবে। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিকে সীমা হবে ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার এবং প্রথমার্ধে হবে ৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতি প্রান্তিকেই আইএমএফ ঋণ গ্রহণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ২০২৩ সালে যখন আইএমএফ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি অনুমোদন করেছিল, তখন এমন কোনো সীমা ছিল না। গত জুনে ছয় মাসের মেয়াদ বাড়িয়ে প্রায় ৮০ কোটি ডলার অতিরিক্ত যোগ করে তারা চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি অনুমোদন করে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে।

আরও